খোলা জানালা

স্মৃতির ডায়েরি : অসাধারণ জীবন ও কর্ম আল্লামা আবদুস শহীদ রাহ.’কে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল

মাহবুব আহমদ রুমন

বৃহত্তর সিলেটের আলেম সমাজের প্রথম সারির একজন অাধ্যাত্মিক রাহবার আল্লামা শায়্খ আবদুস শহীদ গলমুকাপনী রাহ. আজ আর আমাদের মাঝে নেই।তিনি যেমন ছিলেন বিখ্যাত ওলী,তেমনি ছিলেন সমাজ সংস্কারক মুজাদ্দেদ।

সবার কাছে গলমুকাপনের শেখছাব খ্যাত এই বরেণ্য মনীষি শারীরিক উপস্থিতিতে আর কখনো আলো বিলাবেন না।কিন্তু তার অসাধারণ জীবন ও কর্ম তাকে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল।জীবনের অন্তিম মুহুর্ত পর্যন্ত সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ,সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলায় আল্লামা আবদুস শহীদ রাহ’র দাওয়াতী মাহফিল এবং শেষরাতের আবেগভরা কান্নার রোল গণমানুষের মনে এক আলাদা শিহরণ জাগিয়ে তুলতো।জীবনের শেষপর্যন্ত সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামেয়া গলমুকাপন দারুসসুন্নাহ মাদরাসার মুহতামিম ও শাইখুল হাদীসের দায়িত্ব ছিলো তার কাঁধে।ছিলেন আলেম সমাজের অভিভাবক।পালন করেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহ-সভাপতির দায়িত্ব।

১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-২ আসন থেকে জমিয়তের প্রার্থী হিসেবে খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।বাতিলের বিরোদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনের কাতারে।একমাত্র আল্লাহপাক ছাড়া কাউকে পরোয়া করতেন না।তার মাঝে ডর-ভয়-ভীতি কাজ করতো না।হযরতের মধ্যে এমন কিছু গুণ ছিলো যা তাকে করে তুলেছিলো অন্যদের থেকে আলাদা।নিয়মিত তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন।বেশিরভাগ সময়ই জিকিরে মশগুল থাকতেন।ছিলেন কিছুটা অন্তর্মুখী।তার স্বভাবে মজযুব আল্লাহর ওলীদের বৈশিষ্ট্য ছিলো।মিডিয়া তাকে সেভাবে জানতো না।তাকে জানতেন সারা দেশের আলেম সমাজ।তিনি ছিলেন তাওয়াক্বুল ও হিম্মতের অনন্য প্রতীক।আর ছিলেন বিনয়ের উত্তম উদাহরণ।

বহু বরেণ্য আলেমের কাছেও তিনি বরেণ্য ছিলেন তার এ গুণগুলোর কারণে।দিনের বেলায় চলতো তার হাদিস-ফিকহের দরস।আর রাতের গহীনে ছুটতেন মাহফিল থেকে মাহফিলে।এক জেলা থেকে আরেক জেলায়।শহর থেকে অজপাড়াগাঁয়।তিনি প্রতিটি মাহফিলে দরদ ভরা কন্ঠে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ওয়াজ পরিবেশন করতেন।অতি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত শেখছাব রাহ’র পরিধানকৃত জুব্বা,সদরানা,আবায়া,পাগড়ী আর হাতের লাঠিতে ফুটে উঠতো সুন্নতের এক অনুপম সৌন্দর্য।মুখের হাসি তাকে করে তুলেছিলো আরো অতুলনীয়।আল্লামা নুরউদ্দিন গহরপুরী রাহ,আল্লামা ফখরুদ্দিন রাহ,আল্লামা মাসউদ আহমদ দা.বা’র মতো বিখ্যাত বুযুর্গ ছিলেন হযরতের উস্তাদ।উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিপুরুষ আল্লামা হোসাইন আহমদ মাদানী রাহ’র বিশিষ্ট খলিফা আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণবী রাহ.হলেন হযরতের মুর্শীদ,বেয়াই ও ভায়রা ভাই।বি-বাড়িয়ার বিখ্যাত আলেম মাওলানা নুরুল হক ধরমন্ডলী রাহ’র ভগ্নিপতি হলেন শেখছাব রাহ.।বিখ্যাত আলেম আল্লামা আবদুল করিম কৌড়িয়া রাহ.,আল্লামা হাফেজ তফাজ্জল হক হবিগঞ্জী রাহ.তার বেয়াই।শাইখুল হাদীস মাওলানা আবদুল মুমিত ঢেউপাশী রাহ. তার জামাতা।আর কোনো আলেমের এত আলেমদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে বলে আমার জানা নেই।শেখছাব রাহ.খুব রাগী প্রকৃতির একজন মানুষ ছিলেন।তবে মনটা ছিলো খুব নরম।মাদরাসায় যখন পা রাখতেন ছাত্র উস্তাদরা তটস্ত থাকতেন।নড়েচড়ে উঠতেন।হাদিসের দরস যখন দিতেন পুরো কক্ষজুড়ে বইতো পিনপতন নীরবতা।শেখছাব রাহ’কে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার।অসংখ্য-অগণিতবার তার সান্নিধ্য লাভ করেছি।তিনি আমাকে খুব মহব্বত করতেন।তার সাথে আমাদের পারিবারিকভাবে সুসম্পর্ক ছিলো।তিনি সম্পর্কে আমার নানা ছিলেন।নিজের নাতিদের মতো আদর-স্নেহ করতেন।খুব ভালোবাসতেন।আমি ভীষণ শ্রদ্ধা করতাম,মান্য করতাম।শেখছাব রাহ. নানা রকম মজার মজার কথা বলতেন,ঢং করতেন।তার কাছে গেলে বৈঠকখানায় অনেকক্ষণ অালাপ করতেন আমার সাথে।আমাকে দেখেই মুচকি হাসি দিয়ে মোসাফাহার জন্য হাত বাড়িয়ে দিতেন।আমার বই পড়ার নেশা খুব বেশি।নানার টেবিলে অনেক রকম বই থাকতো।যেদিন যে বইটা হাতে নিতাম,বলতেন ‘ইটা তুমি নেওগি'(এটা তুমি নিয়ে যাও)।আহ!কি মহব্বত।এমন করে কেউ তো আর বলবে না।আমার লেখা ইতিহাসের কাঠগড়ায় রাজনীতি বইটি পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন।বইটি লেখায় আমার ভূঁয়সী প্রশংসা আব্বার কাছেও করেছিলেন।

২০১৮ সালে একবার নানা সিলেট নগরীর আইডিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।আমি দেখতে গিয়েছিলাম।আমাকে দেখেই মায়াবী হাসি দিয়ে বরণ করেন।অনেক খুশি হয়েছিলেন সেদিন।তিন চার বছর আগে পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়ন ছাত্র জমিয়তের উদ্যোগে গলমুকাপন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত ইফতার মাহফিলের দিন তার বাড়িতে আরেকটা ইফতার মাহফিল ছিলো।তাই তিনি আগেই বক্তব্য দিয়ে চলে যান।নানার বক্তব্য শেষের এক মিনিট আগে আমি গিয়ে হাজির হই।আমাকে দেখেই বলেন,আমি যাইরাম গি,রুমন সাব আইছইন।তাইন অনে বক্তব্য দিবা (আমি চলে যাব,রুমন সাহেব এসেছেন-তিনি এখন বক্তব্য দিবেন)।এটা যে আমার জন্য কত বড় পাওয়া তা বলে বুঝানো অসম্ভব।দেখা হলে মা-বাবাসহ আমাদের পরিবারের সবার কথা জানতে চাইতেন।শেখছাব নানাকে আবায়া ও পাগড়ীতে অসম্ভব মানাতো।ঈদের জামাতে কিংবা জুমার নামাজে নানার মতো খুৎবা পাঠ করতে আজ পর্যন্ত আমি কাউকে দেখিনি।শেখছাব নানার খুৎবা পাঠ আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।নানা কাউকে ধমক দিলে সে নিমিষেই কেঁপে উঠতো।শুক্রবারে নামাজ আদায় করে মসজিদের বারান্দায় আমি দাঁড়িয়ে থাকাকালে নানা মসজিদ থেকে বের হয়ে বারান্দা থেকে নামার সময় আমি হাত বাড়িয়ে দিতাম।নানা আমার হাত ধরে বারান্দা থেকে নামতেন।এসব এখন কেবল স্মৃতি।স্মৃতিগুলো খুব খুব মনে পড়ছে।নানার কথা ভাবলেই চোখে পানি এসে যায়।নানার মতো সুঠাম দেহের উচ্চতাসম্পন্ন মানুষ আমি খুব কম দেখেছি।তবে শেষজীবনে ডায়াবেটিস থাকায় ভেঙে পরে নানার স্বাস্থ্য।বিভিন্ন রোগে শোকে ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে ভালোই ছিলেন।চলাফেরা করতে পারতেন।

গেলো কয়েক বছর অসুস্থতা তার পিছু ছাড়ছিলো না।কয়েকদিন পরপর হাসপাতাল আর বাড়ি,বাড়ি আর হাসপাতালে ছুটাছুটি করতে হয়েছে।তিনি হৃদরোগ,ডায়াবেটিস,শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন।২১ জুন (২০২০) রোজ রবিবার সকালে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়ে বাড়ি এসেছিলেন।সেদিন ই শেষ দেখা দেখে এসেছিলাম।২৪ জুন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে সিলেট নগরীর রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৫ জুন রোজ বৃহস্পতিবার রাত ২.৩০ মিনেটের সময় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেন তিনি।তার ইন্তেকালে দেশ হারিয়েছে বাতিলের বিরোদ্ধে আপসহীন এক বীর মুজাহিদকে।আর সিলেট হারিয়েছে তাদের এক মহামূল্যবান সম্পদ।এ ধরণের আলেমের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক থাকে।মুহিউসসুন্নাহ আল্লামা ফখরুদ্দিন রাহ. ও তিনি যে ইসলামি প্রতিষ্ঠান রেখে গেছেন এর বদৌলতে কিয়ামত পর্যন্ত তাদের নাম চালু থাকবে।শেখছাব যে আমানত রেখে গেছেন এর হেফাজতে সকলকে ভূমিকা রাখতে হবে।মহান আল্লাহতালার কাছে তার রূহের অপার শান্তি কামনা করে শেষ করছি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য।

 

লেখকঃ কথাসাহিত্যিক ও সাবেক যুগ্ম-আহবায়ক ওসমানীনগর উপজেলা ছাত্রদল।

আরও সংবাদ

Close